Bengali Movie Ahaa Re Review & Download

🎬 “Ahaa Re” (আহা রে…) The Two Lovers

‘হতভাগ্যের গান’, ‘আমসত্ব দুধে ফেলি’, ‘কতবার ভেবেছিনু’।
— রবীন্দ্রনাথ এবং আহা রে।

নববর্ষ মানেই বাংলা ও বাঙালীয়ানা। পয়লা বৈশাখ মানেই বাংলা বছর শুরু। যে ছবিগুলোতে খাঁটি বাঙালীয়ানা রয়েছে। যে ছবিগুলো বাংলার ঐতিহ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং সেই ছবিগুলো বাইরের দেশেও কালজয়ী কিংবা সমাদৃত তেমনি এক ছবি ‘আহা রে…’।

আলাদা ঋতু’তে এক অন্যরকম প্রেমের গল্প বলল ‘আহা রে…’। ভালোবাসার গল্প, প্রাণের টানের গল্প দেখালেন পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাঁর নতুন ছবি ‘আহা রে…’ তে! সরস্বতী পুজা, দোল, দুর্গোৎসব, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বাঙালীয়ানা, বাঙালী পোশাক, বাঙালী অন্দরসজ্জা যদি সব গুলোকে একসাথে দেখতে চান তাহলে দেখে ফেলুন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও আরিফিন শুভ অভিনীত রঞ্জন ঘোষের নতুন ছবি ‘আহা রে…’। আহার এ ছবিতে বড় মাধ্যম। চোখ জুড়নো খাবার দেখতে হলে এ ছবি কিন্তু দেখতেই হবে। বাঙালী খাবার তাঁর ইতিহাস চিংড়ি মাছের মালাইকারি মানে কি দুধের মালাই না অন্য কিছু? কিংবা চিকেন ডাকবাংলো নামটা উদ্ভব কি ভাবে? রান্না শুধু দেখা নয় রান্নার ইতিহাস চর্চা খুব সুক্ষ ভাবে আছে এই ছবিতে।

🍁 চিত্রনাট্য —

রান্না শেখায় দু’দেশের দুজন দুজনের স্টুডেন্ট টিচার। দুজনে দুজনের না পারা গুলো পারা দিয়ে ভরিয়ে তোলে। এভাবেই দুজন দুজনের কাছে আসতে থাকে। রাজার ঢাকায় আছে এক প্রেমিকা শাহিদা কিন্তু তার সঙ্গে মন কষাকষি হওয়ায় রাজা বিধস্ত।

এমন করেই একদিন বসুন্ধরার দেখা হয় অচেনা এক যুবক শেফ রাজা চৌধুরির সঙ্গে। কচুরী ছোলার ডালে ঝগড়া থেকে ভাব। রাজা চৌধুরী হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করা বাংলাদেশের ঢাকার পাঁচতারা হোটেলের চিফ শেফ। রাজার আসল নাম ফারহাজ চৌধুরী। শেফ রাজা বিশ্বাস করে রান্নায় নিয়ম বইয়ের পুঁথি পড়া বিদ্যা জরুরি নয় রান্নায় আসল হল কল্পনা ইমাজিনেশান সেটাই অন্যদের সঙ্গে রান্নায় স্বতন্ত্রতা এনে দেয়। এই রাজাই নতুন জগতে নতুন হোটেলে আসে ঢাকা থেকে কলকাতার পাঁচ তারা হোটেলে শেফ হয়ে। রাজার মা ও মায়ের দ্বিতীয় স্বামী থাকেন ঢাকায়। রাজা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি তাঁর দ্বিতীয় বাবাকে। সেই পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতেও ভালো অফার পেতে চলে আসে কলকাতায়। রাজার বাবা মা খোঁজ নেন ফোন করে। কিন্তু এখানে ভালো রান্নার লোক লাগবে রাজার। ঠিকে মাসীর রান্না রাজার মুখে রোচেনা। আর এই সমস্যার মুশকিল আসান হয়ে আসে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হোম ডেলিভারি ক্যাটারিং সার্ভিস। সেখানেই আবার দেখা হয় বসুন্ধরা-রাজার। এরমধ্যে একদিন পড়ে রাজার জন্মদিন। মায়ের ফোন এলেও মায়ের হাতের জন্মদিনের পায়েস আসা সম্ভব না ঢাকা থেকে কিন্তু বসুন্ধরার ভুল হয়না সে নিজে পায়েস রেঁধে রাজার হোম ডেলিভারির অর্ডারের সঙ্গে পাঠিয়ে দেয় ভাইয়ের হাত দিয়ে রাজাকে তাঁর জন্মদিনের পায়েস উপহার স্বরুপ। বসুন্ধরার এই আন্তরিকতাই রাজার মন ভালো করে দেয়। বসুন্ধরা কলকাতা পশ্চিমবাংলার রান্নায় পাকা রাঁধুনী। রাজা আবার বাংলাদেশের রান্নায় পাকা শেফ। সঙ্গে জানে লইট্যা মাছের রেসিপি থেকে শুরু করে চাইনিজ অব্দি সবটা কিন্তু রাজার কলকাতার বাঙালী রান্না একেবারেই অজানা। আর রাজার পাঁচতারা হোটেলে সেটারই ডিম্যান্ড। অন্যদিকে বসুন্ধরার ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হোম ডেলিভারি তে কেউ চাইনিজ অর্ডার দিলে সেগুলো বানাতে না পারার জন্য ছেড়ে দিতে হয়। এছাড়াও আছে ‘খিদে বিদেয়’ প্রভৃতি আরো অনেক চাইনিজ হোম ডেলিভারি সার্ভিসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা।

এরমাঝেই রাজার পাঁচতারা হোটেল দেখতে আসে বসুন্ধরা। সেখানেও হটকেক বসুন্ধরার বাঙালী রান্না। আর রাজা বসুন্ধরাকে উপহার দেয় বসুন্ধরার প্রিয় পান্তা খাবার। এভাবেই রাজা বলে ফেলে বসুন্ধরাকে ভালোবাসার কথা।

Download Now

ঠিক এই পরিস্থিতিতেই উদয় হন বসুন্ধরার পিতৃদেব পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ,আরো কিছু পরিচয় ওনার আছে যদিও। তিনি একজন মুক্তমনা পিতা। যখন তার ছোটো ছেলে বলে “দিদি তো রাজাদার থেকে বয়সে বড়, রাজাদা মুসলমান লোকে কি বলবে?” তখন পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিহাস থেকে ফিল্মি জগতের উদাহরণ টেনে বলেন কেন নার্গিস- সুনীল দত্ত কিংবা আমাদের ঘরের মেয়ে শর্মিলা তোদের শাহরুখ খান করেনি অন্য ধর্মে বিবাহ?” তখন তাঁর ছেলে বলে “ওরা বড়লোক বাবা ওরা সব পারে আমরা পারিনা লোকে কি বলবে!” কিন্তু একজন মুক্তমনা পিতা বলেন “কে বলেছে আমরা মধ্যবিত্তরা পারিনা?লোকে কি বলবে নিয়ে তোরা থাক।” সব প্রেমের ছবিতে বাঁধা হয়ে দাড়ায় পিতামাতারা। এতদিন যা বলিউড হিট ছবি হয়েছে দুই ধর্ম নিয়ে সেখানে পিতারাই ভিলেন। কিন্তু ‘আহা রে…’ ছবি এক বিপ্লব যেখানে একজন পিতা তাঁর কন্যার ভবিষ্যত ভেবে ধর্মকে বয়সকে তুচ্ছ করে সমাজের চোখ রাঙানিকে তুচ্ছ করে মানুষকে সম্মান দিচ্ছেন। যিনি বিশ্বাস করেন জ্যোতিষে গন, রাশি ইত্যাদিতে তিনি সেই মুসলিম ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলছেন যে বলে “তাঁর গন জনগন”। মানবতাই আসল ধর্ম। ‘আহা রে…’ ছবি এই মেসেজটা দেয়। যখন পরান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন “আমাদের সৃষ্টিকর্তা কিন্তু এক ভগবান।

ছবির বাকি গল্প দেখতে হলে যেতে হবে। ‘আহা রে…’ ছবির প্রথম ভাগ গল্পের বুনন আর দ্বিতীয় ভাগ আরো টানটান গল্প নতুন দিকে মোড় নেয় চমক আছে গল্পে যা ট্রেলার দেখে বোঝা সম্ভব নাহ। আর এখানেই পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাঁর কাহিনী চিত্রনাট্যে বাজিমাৎ করেছেন। খাবার নিয়ে আজকাল টালিগঞ্জ পাড়ায় অনেক ছবি হবার ট্রেন্ড চালু হয়েছে। ‘আহা রে…’ কিন্তু সরল সোজা শুধু শেফ রাঁধুনি খাবার রেসিপি প্রদর্শিত করার গল্প নয়। একটা ভালো সম্পর্কের ছবি যা আমরা পেতাম ঋতুপর্ণ ঘোষের থেকে।

এমনি আলাদা এক চিত্রনাট্য বললেন রঞ্জন ঘোষ।

শুধু ওদের ভালোবাসাই শেষ কথা নয়। আয়চে দু’ধর্মের বিশ্বাস। বসুন্ধরা রাজার থেকে বয়সে বড়। সমাজ কি চোঁখে দেংবে এই সম্পর্ক! এসবের উত্তর খুঁজতে হলে চট করে আপনাকে দেখতে হবে ‘আহা রে…’। কমন গল্পের বাহিরে এসে আপনার ভালো লাগবে।

🍁 দু’কথা—

এই ছবির হিরো বাংলাদেশের হার্টথ্রব আরিফিন শুভ। যে কিনা মডেলিং থেকে কর্মাশিয়াল অভিনয় ঘরানাতে অভ্যস্ত, সিক্স প্যাক, হার্ডকোর মেনস্ট্রিম ছবির হিরো সে কতটা এরকম বাংলা ছবিতে সাফল্য পাবে ধোঁয়াশা ছিল।

কিন্তু সব কুয়াশা কাটিয়ে সূর্যের আলোতে উদ্ভাসিত শুভর অভিনয় ও লুক এই ছবিতে। কলকাতার দর্শক শুভকে ‘আহা রে…’ ছবি দিয়েই চিনল। ছবির শুরু থেকে শেষ শুভ যেভাবে অভিনয় করেছেন নিঃসন্দেহে বলা যায় কলকাতার টালিগঞ্জ পাড়া এক নতুন নায়ক পেল। শুভর বিপরীতে এখানে ঋতুপর্ণার মতো ম্যাচিউর নায়িকা সেখানে শুভর অভিনয়ে কোনো জড়তা নেই। বেশ চুপচাপ অথচ হাল না ছাড়া সাহস করে এগিয়ে সাফল্য পাওয়া একটা চরিত্র রাজা চৌধুরী ওরফে শুভ। যে চুপচাপ থেকে বসুন্ধরা শত বাঁধা দেওয়া সত্ত্বেও জোম্যাটো তে ‘ ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হোম ডেলিভারির বিজ্ঞাপন দিয়ে দেয়। একদম নতুন লুক দিয়েছে শুভ’কে রঞ্জন। একজন ভালো অভিনেতা আবার নায়ক হবার সব গুন যার আছে এবং শুভর কন্ঠ বাচনভঙ্গী খুব সুন্দর। শুভকে মনে হয়নি এটাই তার প্রথম কলকাতার ছবি।

ছবি প্রচার থেকেই অনেকের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বয়সে বড় নায়িকা ছোটো নায়ক। কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিকতা ভাঙার সময় এসছে। ছবিতে কোথাও ঋতুপর্ণা তাঁর বয়স লুক গোপন করেননি। ছবির চিত্রনাট্যতে এটাই ডিম্যান্ডিং। ঋতু বরং বেশী লুকেই ছবিতে মেকআপহীন। হয়ত এমনটাই চেয়েছিলেন পরিচালক। ঋতুপর্ণার একটি সেরা অভিনয় এ ছবি। একটা ছবিকে কোনো তথাকথিত গ্ল্যামার অবলম্বন না করে অভিনয় দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্য এগিয়ে নিয়ে চলেছেন ঋতুপর্না। ছবির শেষ দিকে পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতুপর্ণার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে অভিনয় অনেকদিন মনে থাকবে আর এই দৃশ্যে রঞ্জনের চিত্রনাট্যে ডায়লগ অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

তবে এ ছবি কিন্তু সম্পর্কের ছবি। খাবার একটা মাধ্যম এ ছবির কিন্তু আসলে মন কেমনের গল্প এ ছবি। এক মুক্তমনা ছবি ‘আহা রে…’। সেটাই এ ছবির বিপ্লব। বসুন্ধরা এ ছবির নায়িকা। নায়িকা যদিও সে লুকে নয়, বসুন্ধরা নায়িকা জীবন যুদ্ধের। এক সাধারন মেয়ের অসাধারন হয়ে ওঠার গল্প ‘আহা রে…’। বসুন্ধরা তাঁর বাবা ও ছোটো ভাইয়ের জন্য, সংসারের জন্য নিজের ভালোবাসার রান্নার গুণকে কাজে লাগায়। ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হোম ডেলিভারি ক্যাটারিং সার্ভিস, রান্না করে নিজেই চালায় বসুন্ধরা, সঙ্গে বসুন্ধরার লক্ষণ সম ভাইয়ের সাহায্য, সবার ওপরে ভরসার হাত তাঁদের বাবার। ‘ইয়ং বেঙ্গল’ ছোটো হলেও রান্নায় সুস্বাদু।

সারা শরীর দিয়ে জাত অভিনেতারা অভিনয় করেন এটা পরান বন্দোপাধ্যায়’কে দেখলে মালুম হয়। তবে ছবিটা আরেকটু ছোটো করা যেত। আরেকটু কমপ্যাক্ট হত হয়ত।

‘আহা রে…’ একজন জয়ী নারীর গল্প। সফল মানুষের গল্প। ‘আহা রে…’তে আরিফিন শুভ চলনসই। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তাও ঠিকঠাকই সঙ্গ দিয়েছেন।

কিছু ছবি শুধু বাংলা নয় ! বরং বাঙালির ছবি। এই ছবিও কিন্তু বাঙালীর গল্প বলে। দুই বাংলার আহারের গল্প বলে। দুই ধর্মে ভালোবাসার গল্প বলে। মুক্তমনা পরিবারের গল্প বলে। তরুন মজুমদারের আলোর পর ঋতুপর্ণার একটা ভালো বাঙালী ছবি। পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় এ ছবির সম্পদ। বাংলাদেশের লোকের কাছে এই ছবি সমান জনপ্রিয়। দুই দেশ দুই ধর্ম অথচ তারা দুই পরিবারই বাঙালী বাংলায় কথা বলে বাংলায় লেখে। শুধু ধর্ম ভিন্ন বলে কি সম্পর্ক সম্ভব নয়? বিধাতা সৃষ্টিকর্তা কিন্তু এক। আহা রে সেই মুক্তমনের গপ্প বলে। এ ছবি কুসংস্কারমুক্ত বাঙালী ছবি।

এক কথায় ‘আহা রে…’ একটি সৎ, সহজ সরল এবং বিরল ছবি। এ ছবি সম্পর্কের ছবি। ভালোবাসার ছবি। খাবার একটা মাধ্যম যাষ্ট। চমৎকার অভিনয়। যেন ৯০ দশকের খাটি বাঙালীয়ানা ছবি। এত সহজ সরল ভালো অভিনয় অনেক দিন দেখিনা।

📌 Genre: Drama
📌Country: India
📌Language: Bangla
📌 Script: Ranjan Ghosh
📌Direction: Ranjan Ghosh
📌Running time: 119 minutes, 54 Second🔥

💢 Cast 💢
Arifin Shuvoo,
Rituparna Sengupta,
Paran Bandopadhyay,
Amrita Chattipadhyay,
Shubhro S Das,
Anuvab Pal,
Nirmal Chakravarty,
Animesh Ganguly Subho,
Sharmistha Mukherjee,
Anindya Sengupta,
Subhadeep Kantal Many More…

পার্সোনাল রেটিং— (A+)

Nb— শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়’র তরে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

✍ লিখেছেন ‘মাহাবুব বিন আনসারী’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *